
দেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় এক অদ্ভুত ও প্রশ্নবিদ্ধ চিত্র ফুটে উঠেছে। একই বয়সের দুই শিক্ষার্থী, যারা একই স্তরের শিক্ষা সম্পন্ন করছে, তাদের একজনের জন্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বা বৃত্তির দুয়ার বন্ধ থাকলেও অন্যজনের জন্য তা সচল। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃত্তি বন্ধ রাখা হলেও মাদ্রাসার ‘এবতেদায়ী’ স্তরে তা চালু রাখায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র বৈষম্য ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
বৈষম্যের চিত্র: একদিকে স্থগিত, অন্যদিকে নিয়মিত
গত কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সরকারি প্রাথমিক বৃত্তি কার্যক্রম নানা অজুহাতে থমকে আছে। বাজেট সংকট বা নীতিমালার মারপ্যাঁচে আটকে আছে সাধারণ শিশুদের মেধার স্বীকৃতি। অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে তাদের বৃত্তির অর্থ পাচ্ছে।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি:
সরকারি প্রাথমিক: বাজেট ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণ দেখিয়ে বৃত্তি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ।
এবতেদায়ী মাদ্রাসা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়মিত বরাদ্দ ও বৃত্তি প্রদান অব্যাহত।
প্রভাব: মেধাবী ও বিশেষ করে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা নাকি সদিচ্ছার অভাব?
শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চলে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, আর এবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কিন্তু মন্ত্রণালয় আলাদা হলেও শিক্ষার্থীদের পরিচয় এক—তারা সবাই দেশের ভবিষ্যৎ। এই প্রশাসনিক দেয়াল এখন মেধাবী শিশুদের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“রাষ্ট্র যখন সবার জন্য সমান অধিকারের কথা বলে, তখন শিক্ষার একটি মৌলিক স্তরে এমন দ্বৈতনীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করছে।” — একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ।
অভিভাবকদের আর্তনাদ
সাধারণ অভিভাবকরা মনে করছেন, এটি রাষ্ট্রের ঘোষিত ‘সমতা ও ন্যায্যতা’ নীতির পরিপন্থী। অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য এই বৃত্তির টাকাটুকু ছিল বড় অবলম্বন। এক স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীর অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার সন্তান ও প্রতিবেশী মাদ্রাসা ছাত্র একই সাথে পড়ে, কিন্তু একজন টাকা পাচ্ছে আর অন্যজন বঞ্চিত। এই বৈষম্য আমরা কেন মেনে নেব?”
উত্তরণের পথ: সমন্বিত শিক্ষানীতি
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বৈষম্য দূর করতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
প্রাথমিক স্তরের সব বৃত্তি কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত একক নীতিমালার অধীনে আনা।
মন্ত্রণালয় নির্বিশেষে অভিন্ন মানদণ্ডে মেধাক্রম যাচাই করা।
অজুহাত বাদ দিয়ে দ্রুত সরকারি প্রাথমিক বৃত্তি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
শিক্ষায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ জনশক্তির মান ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে—এমনই আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের।
মন্তব্য করুন