
মুজিব উল্ল্যাহ্ তুষার :
০৯ এপ্রিল ২৬ (বৃহস্পতিবার) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান ও চাংলান’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি বলেছেন, পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ঘোষণা করেন, এখন থেকে আর ‘বৈসাবি’ নয়, আমরা এই সামাজিক উৎসবগুলোকে যার যার সম্প্রদায়ের নিজস্ব স্বকীয় রীতিতে পালন করবো। আমরা চাই না এ ধরনের সামাজিক উৎসবে কোনো প্রকার বৈষম্যের সুযোগ থাকুক।
মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি বলেন, আমাদের চাকমা সম্প্রদায়ের সামাজিক উৎসব হলো বিজু। এ বিজু উৎসব আগে মন্ত্রণালয় পালন করতো বৈসাবি হিসেবে। সেখানে বৈসাবি ৩টি সম্প্রদায়ের ৩ আদ্যক্ষর থেকে এসেছে। ত্রিপুরা সম্প্রদায় বলে বৈসু, মারমা সম্প্রদায় বলে থাকে সাংগ্রাই, আর চাকমা সম্প্রদায় এ উৎসবকে আখ্যায়িত করে বিজু নামে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি সম্প্রদায়ের এই উৎসবের নাম শুধু বৈসাবি হতে পারে না। আমি মনে করি এই বৈসাবি নামকরণ দিয়ে বিগত সরকার অন্যান্য সম্প্রদায়ের জাতি সত্ত্বাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, আমাদের প্রধামন্ত্রী জননেতা তারেক রহমান এ বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন- বাংলাদেশে জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে যে যে সম্প্রদায় রয়েছে, সব সম্প্রদায়ের নিজস্ব স্বকীয় নাম নিয়ে এ মানবিক উৎসবটি পালিত হবে। কাউকে বঞ্চিত করে নয়, কাউকে বাদ দিয়ে নয়- যে সম্প্রদায় যে নামে এই সামাজিক উৎসবটি পালন করবে সেই নামেই তা অভিহিত হবে। মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা এখানে বলতে চাচ্ছি- বিজু, সাংগ্রাই, বৈষু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান এ নামগুলোকে সামনে রেখে আমরা আগামি ১২ এপ্রিল রাজধানীতে বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি প্রোগ্রাম করতে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমাদের স্বকীয় কৃষ্টি, যে যেই রীতিতে উৎসব পালন করে থাকে তাদেরকে সে রীতি উৎসব পালন করার সুযোগ দিতে হবে, সম্মান জানাতে হবে। মন্ত্রী বলেন, সে লক্ষ্যেই আমরা এই প্রেস কনফান্সে আজ মিলিত হয়েছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো জাতিকে তা জানানো। আমরা সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকতে চাই। কোনো রকম বৈষম্য আমরা চাই না। মন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি সম্প্রদায়ের মূল বার্তা হলো শান্তি ও সম্প্রীতি। মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমান চান সকল শ্রেণি, পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান গুরুত্ব দিয়ে নিজ নিজ সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পরিচালনা করবেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের স্বকীয়তা রক্ষা ও উন্নয়নে নিরলস কাজ করছে।
মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি উৎসবের সময়সূচী উল্লেখ করে জানান, ১২ এপ্রিল ২৯ চৈত্র -১৪৩২ খ্রি. আমরা পালন করি ফুল বিজু। আমরা ফুল নিয়ে জলের কাছে পৌঁছাই। আমরা ফুলকে শ্রদ্ধা করি, প্রণাম করি। অনেকে বলে থাকেন, আমরা পানিতে ফুল ভাসিয়ে দিই। কথাটি সঠিক নয়। মূলত: ফুল বিজু হলো আমাদের শ্রদ্ধা ও প্রার্থনার দিন। আমরা পানিতে ফুল গছিয়ে দিই, ভাসিয়ে নয়। মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি আরও বলেন, আমরা ১৩ এপ্রিল ৩০ চৈত্র- বাংলা বর্ষের শেষ দিন। মূল বিজু উৎসবে আমরা নতুন কাপড় পরিধান করি। জুনিয়রদের সালামি দিই। সবাই এক মিলন মেলায় জড়িত হই এই দিনে। এবং শেষে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ যে জিনিসটি অত্যন্ত শুভকর, আ আমরা ব্যবহার করি। আমরা মনে করি ১২, ১৩ ও ১৪ এপ্রিল আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। ১৪ এপ্রিল আমরা বুদ্ধিস্ট সম্প্রদায় খিয়াং এ যাই প্রার্থনায় যোগ দিই। এদিন মারমা সম্প্রদায় জলকেলি উৎসবে মেতে উঠে। এ উৎসবে আমাদের আশীর্বাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়। এ উৎসব আমাদের সামাজিক বড় উৎসব। এখানে পাহাড়ি-বাঙালি কোনো ভেদাভেদ নেই। এর মাধ্যমে আমাদের ঐক্য গড়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এমপি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চান সকল উৎসবে সাত রঙের মিশ্রণ থাকুক। রংধনুর যেমন ভ্যারাইটি আছে, তেমনি সকল সম্প্রদায়ের নিজস্ব স্বকীয়তা উৎসবে ফুটে উঠবে—এটাই স্বাভাবিক। আমাদের ঐতিহ্যই আমাদের শক্তি। তিনি আরও যোগ করেন, এই উৎসবগুলো কেবল নিছক অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের শেকড় ও পরিচয়। পাহাড়ি জনগণের স্বকীয়তা রক্ষা করে তাদের উন্নয়নের মূলস্রোতে সম্পৃক্ত রাখাই আমাদের সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
আগামী ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রাজধানীর বেইলি রোডস্থ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স’ থেকে রমনা পার্কের লেক পর্যন্ত এক বর্ণাঢ্য র্যালি ও পুষ্প বিসর্জন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ০৮:৩০ মিনিটে এই উৎসবমুখর পদযাত্রা শুরু হবে।
মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বান্দরবান পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য সাচিং প্রু, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকবৃন্দ।
মন্তব্য করুন